মৃত্যু এসেছিল একদিন—
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই,
নিঃশব্দে,
যেন বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া
কোনো পরিচিত ছায়া।
আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিল সে,
তার চোখে অনন্ত অন্ধকার,
অথচ মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
আমি তখন শুয়ে আছি
হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায়।
শরীর আমার,
অথচ শরীরের ওপর আমার কোনো অধিকার নেই।
চারদিকে যন্ত্রের অবিরাম গুঞ্জন,
মনিটরের সবুজ রেখায়
কাঁপছে আমার পৃথিবী।
একেকটি হৃদস্পন্দন
যেন অন্ধকার সমুদ্রের বুক থেকে
ভেসে আসা শেষ কোনো সংকেত।
সেদিন আমার বুকের দরজা খুলেছিলেন চিকিৎসকেরা।
রক্ত, মাংস আর অস্থির গভীরে
তাঁরা খুঁজছিলেন
জীবন ফিরে আসার গোপন পথ।
আর আমি—
অচেতনতার অতল অন্ধকারে
হয়তো খুঁজে ফিরছিলাম
আমার ফেলে আসা দিনগুলো।
কে জানে,
সেই দীর্ঘ নিদ্রার ভেতর
কোন আকাশে ভেসেছিল আমার শৈশব,
কোন নদীর জলে ধুয়ে গিয়েছিল অভিমান,
কোন অদেখা দরজার ওপারে
অপেক্ষা করছিল
আমার জীবনের হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা!
হয়তো সময় তখন থেমে গিয়েছিল।
ঘড়ির কাঁটা খুলে রেখে
অনন্তকাল বসেছিল আমার মাথার কাছে।
জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে
ঝুলে ছিলাম আমি—
যেন ছেঁড়া সুতোয় বাঁধা
একটি নিঃসঙ্গ নক্ষত্র।
কত কিছুই না জরুরি ছিল একদিন!
কত হিসাব, কত অহংকার,
কত অকারণ অভিমান!
কত মানুষের সামনে
নিজেকে প্রমাণ করার ক্লান্ত আয়োজন!
অথচ মৃত্যুর নিঃশ্বাস যখন
আমার মুখ ছুঁয়ে গেল,
দেখলাম—
জীবনের সমস্ত অর্জন
কী আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় মিশে যায়!
যে পৃথিবীকে এতদিন
নিজের বলে ভেবেছি,
সে পৃথিবী তখন
একটি মাত্র সকালের সমান।
শুধু একবার চোখ মেলে
আলো দেখতে চেয়েছিলাম।
শুধু আরেকবার শুনতে চেয়েছিলাম
প্রিয় কোনো কণ্ঠের ডাক।
শুধু একবার
কারও হাতের উষ্ণতায়
ফিরে পেতে চেয়েছিলাম
আমার হারিয়ে যেতে বসা পৃথিবী।
তারপর একদিন ভোর হলো।
হাসপাতালের জানালা বেয়ে
একফালি রোদ এসে পড়ল বিছানায়।
মনে হলো,
সূর্য আজ পৃথিবীর জন্য ওঠেনি,
সমস্ত মহাকাশ পেরিয়ে
সে এসেছে শুধু আমায় দেখতে।
আলো এসে ছুঁয়ে দিল
আমার ক্ষতবিক্ষত বুক,
যেন অদৃশ্য কোনো মা
সন্তানের কপালে হাত রেখে বলছেন—
ফিরে এসো,
তোমার পৃথিবী এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম,
পুনর্জন্মের জন্য
আরেকটি মাতৃগর্ভের প্রয়োজন হয় না।
কখনো কখনো
হাসপাতালের একটি সাদা বিছানাই
মানুষের দ্বিতীয় জন্মভূমি হয়ে ওঠে।
এখন আমার বুকের মাঝখানে
দীর্ঘ এক ক্ষতচিহ্ন।
যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে
আমার শরীরের ওপর লিখে দিয়েছে
জীবন ও মৃত্যুর গোপন ইতিহাস।
শরীরজুড়ে অস্ত্রোপচারের স্মৃতি,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ব্যথার নীল আগুন,
পায়ের নিচে ক্লান্তির দীর্ঘ ছায়া।
কখনো মনে হয়,
আমার বুকের ভেতর
এখনো কোনো অদৃশ্য কারিগর
ভাঙা এক ঘড়ির কাঁটা মেরামত করছেন।
তবু এই ক্ষত আমার পরাজয় নয়।
এই সেলাইয়ের প্রতিটি রেখা
ফিরে আসার একেকটি অক্ষর।
আমার বুক এখন
একটি অসমাপ্ত কবিতার পাণ্ডুলিপি,
যেখানে মৃত্যুর কালো কালি মুছে
জীবন লিখে চলেছে
তার নতুন শব্দমালা।
এখন আমি জানি,
সব পথ দৌড়ে পেরোতে নেই।
কিছু পথে ধীরে হাঁটতে হয়,
কিছু বিকেল কেবল আকাশের জন্য,
কিছু নীরবতা
নিজের হৃদস্পন্দন শোনার জন্য।
এখন একটি পাখির ডানায়
আমি সময়ের শব্দ শুনি।
বৃষ্টির ফোঁটায় দেখি
অজস্র আলোকিত দিনের মুখ।
একটি সাধারণ সকালের আলোতেও
খুঁজে পাই
অলৌকিক বেঁচে থাকার বিস্ময়।
যে মানুষটি বিপদের রাতে
নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়েছিল,
যে হাতটি আমার হাত ছেড়ে যায়নি,
যে চোখ আমার জন্য
গোপনে অশ্রু জমিয়েছিল,
যে কণ্ঠ গভীর রাতে জানতে চেয়েছিল—
আমি কেমন আছি,
তাদের মুখ এখন
আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র মানচিত্র।
মৃত্যুর এত কাছে গিয়ে বুঝেছি,
মানুষ আসলে মানুষের ভেতরেই বেঁচে থাকে।
কোনো পদবি, কোনো প্রাপ্তি,
কোনো উঁচু আসন
শেষ অন্ধকারে আলো জ্বালাতে পারে না।
পারে কেবল ভালোবাসা,
কারও বুকের গোপন প্রার্থনা,
কারও চোখে জমে থাকা
একফোঁটা না-বলা জল।
আমি জানি না,
আমার জন্য আর কতগুলো বসন্ত
অপেক্ষা করে আছে।
জানি না,
কতগুলো শরৎ এসে
আমার জানালায় সাদা মেঘ রেখে যাবে।
কিংবা কোন এক শীতের ভোরে
শেষবারের মতো
আমার নাম ধরে ডাকবে পৃথিবী।
শুধু জানি—
আমি আর সেই আগের মানুষটি নই।
আমার বুকের গভীরে
এখন নতুন পথে রক্ত বয়ে যায়।
মনে হয়,
সেখানে নতুন এক নদীর জন্ম হয়েছে।
সে নদী বয়ে চলে
অজানা কোনো সমুদ্রের দিকে,
তার প্রতিটি ঢেউয়ে লেখা—
এখনো সময় আছে,
এখনো ভালোবাসা বাকি।
যদি জীবন আবার আমাকে পথে ডাকে,
আমি হাঁটব।
তবে আর আগের মতো
অন্ধ তাড়নায় নয়।
পথের ধারে থামব,
অচেনা ফুলের দিকে তাকাব,
কোনো ক্লান্ত মানুষের পাশে বসব।
প্রিয় মানুষকে বলব—
ভালোবাসি।
যতদিন কণ্ঠে শব্দ আছে,
যতদিন চোখে আলো আছে,
যতদিন বুকের গভীরে
এই আহত হৃদয়টি স্পন্দিত হয়।
আর কোনো ভালোবাসা
আগামীকালের জন্য জমিয়ে রাখব না।
কারণ আমি দেখেছি—
আগামীকাল কখনো কখনো
পৃথিবীর সবচেয়ে অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি।
আমি জানি,
একদিন আবার মৃত্যু আসবে।
হয়তো সেদিনও
নিঃশব্দে দাঁড়াবে আমার শিয়রে।
কিন্তু এবার তাকে বলার মতো
আমার কিছু কথা থাকবে।
বলব—
আমি তোমাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি।
তোমার অন্ধকারে
আমার সমস্ত অহংকার হারিয়েছি।
তোমার দরজা থেকে ফিরে এসে
আমি চিনেছি
একটি সকালের অসীম মূল্য,
একটি স্পর্শের গভীরতা,
একটি মানুষের জন্য
অন্য মানুষের অপেক্ষার অর্থ।
যেদিন সত্যিই চলে যাব,
সেদিন আমার সঙ্গে যাবে না
কোনো অর্জনের অহংকার,
কোনো অপূর্ণ হিসাব,
কোনো পার্থিব পরিচয়।
রয়ে যাবে হয়তো
কিছু ছড়িয়ে থাকা স্মৃতি,
কোনো পুরোনো ছবির ধূসর হাসি,
কোনো মানুষের বুকের গভীরে
আমার নামে জমে থাকা
একটুখানি নীরবতা।
হয়তো কোনো বৃষ্টির দুপুরে
হঠাৎ কেউ আমাকে মনে করবে।
হয়তো কোনো সন্ধ্যায়
অকারণেই কারও চোখ ভিজে উঠবে।
হয়তো আমার না-থাকার শূন্যতায়
এক মুহূর্তের জন্য থেমে যাবে
কারও চেনা পৃথিবী।
এইটুকুই তো মানুষের অনন্তকাল।
আমি ফিরে এসেছি—
মৃত্যুকে পরাজিত করার
কোনো বিজয়মুকুট মাথায় নিয়ে নয়।
ফিরে এসেছি
বুকভরা ক্ষত,
চোখভরা নতুন আলো,
আর হৃদয়ের গভীরে
অদ্ভুত এক বিনয় নিয়ে।
এখন প্রতিটি সকাল
আমার কাছে ধার পাওয়া এক টুকরো অনন্তকাল।
প্রতিটি নিঃশ্বাস
অদৃশ্য কারও দেওয়া
একটি অসমাপ্ত উপহার।
আর আমার বুকের ভেতর
যে হৃদয়টি আবার বেজে ওঠে,
তার প্রতিটি স্পন্দনে
আমি যেন শুনতে পাই
দূর কোনো নক্ষত্রলোক থেকে
জীবনের মৃদু আহ্বান—
ফিরে এসেছ যখন,
এবার শুধু বেঁচে থেকো না,
ভালোবাসো।
কারণ মৃত্যুর খুব কাছে গিয়ে
আমি জেনেছি—
বেঁচে থাকা এক আশ্চর্য বিস্ময়,
আর ভালোবাসা
সেই বিস্ময়ের সবচেয়ে গভীর অর্থ।