শেষ ঠিকানা – জয় আমির

Share

একদিন একজন পথিকের মৃত্যু হলো। তার নাম ছিল রহমান। পৃথিবীতে সে অনেক দুঃখ দেখেছিল—অভাব, বিচ্ছেদ, রোগ, ভয়। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় সে কেবল একটাই প্রার্থনা করেছিল, “যদি কোনো শান্তির জায়গা থাকে, আমাকে সেখানে নিয়ে যাও।”

চোখ খুলতেই সে নিজেকে এক অদ্ভুত আলোয় ভাসতে দেখল। আলোটা সূর্যের মতো তীব্র নয়, বরং এমন নরম যে চোখ জ্বলে না। সামনে এক বিশাল নগরী দাঁড়িয়ে—দেয়ালগুলো সোনা ও মণি-মাণিক্যের, দরজাগুলো মুক্তার। নগরীর নাম কেউ জানে না। কেউ বলে জান্নাত, কেউ বলে নতুন জেরুশালেম, কেউ বলে স্বর্গলোক। কিন্তু সবাই একমত—এখানে কোনো দুঃখ নেই।

রহমান ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। প্রথমেই তার চোখে পড়ল এক স্বচ্ছ নদী। নদীর জল দুধের মতো সাদা, মধুর মতো মিষ্টি। কেউ বলল, “এটা জীবনদায়ী নদী।” কেউ বলল, “এটা গঙ্গা বা যমুনা নয়, এটা পরমেশ্বরের করুণার স্রোত।” নদীর ধারে ফলের বাগান। আপেল, আঙুর, ডালিম, এমনকি এমন ফলও আছে যা পৃথিবীতে কখনো দেখা যায়নি। পাতাগুলো ছায়া দেয়, কিন্তু কখনো শুকিয়ে পড়ে না।

একটা সিংহ শান্তভাবে শুয়ে আছে ফলের গাছের নিচে। তার পাশে একটা বাচ্চা মেষ। রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সিংহ তাকে দেখে মাথা নেড়ে বলল, “এখানে আর শিকার নেই। এখানে শুধু শান্তি।”

নগরীর ভেতরে ঢুকতেই রহমান দেখল অসংখ্য মানুষ। কেউ সাদা পোশাক পরে আছে, কেউ উজ্জ্বল আলোয় মোড়া। সবাই হাসছে। কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, কেউ গান গাইছে। কেউ পরিবারের সাথে বসে আছে—মা, বাবা, সন্তান, বন্ধু—সবাই একসাথে। এখানে কেউ আর মরে না। কেউ আর বয়স হয় না। সবাই চিরযৌবন ধরে রেখেছে।

একজন বৃদ্ধ চেহারার মানুষ এগিয়ে এসে রহমানের হাত ধরল। তার চোখে অদ্ভুত স্নেহ। তিনি বললেন, “তুমি চেয়েছিলে শান্তি। এখানে সেই শান্তি আছে। এখানে আর কোনো ভয় নেই, কোনো অশ্রু নেই, কোনো মৃত্যু নেই।”

রহমান জিজ্ঞেস করল, “এখানে কে আছেন? কার উপস্থিতিতে এত আনন্দ?”

বৃদ্ধ হাসলেন। “কিছু মানুষ বলেন আল্লাহ। কিছু মানুষ বলেন ঈশ্বর। কিছু মানুষ বলেন ভগবান। নাম ভিন্ন, কিন্তু উপস্থিতি এক। তিনি এখানে আছেন। তাঁর আলোতেই সবকিছু উজ্জ্বল।”

রহমান চারপাশে তাকাল। দূরে একটা পর্বতের উপর সোনালি প্রাসাদ। তার চারপাশে জলপ্রপাত ঝরছে। আরও দূরে সবুজ ঘাসের মাঠ, যেখানে মানুষ বসে গল্প করছে, হাসছে, কখনো কখনো নীরবে চোখ বুজে বসে আছে—শুধু উপস্থিতির আনন্দ উপভোগ করছে।

সে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাগানে পৌঁছাল। সেখানে একজন তরুণ বসে আছে। তার চোখে অদ্ভুত প্রশান্তি। রহমান জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”

তরুণ হাসল। “আমি সেই, যাকে তোমরা কখনো কখনো বুদ্ধ বলে ডাকো, কখনো কৃষ্ণ, কখনো যীশু। আসলে আমি কেবল একজন পথপ্রদর্শক। এখানে এসে সবাই এক হয়ে যায়।”

রহমান বুঝতে পারল। এখানে ধর্মের দেয়াল নেই। এখানে শুধু একটাই সত্য—অনন্ত সুখ, অনন্ত শান্তি, এবং প্রিয়জনদের সাথে চিরকালের মিলন।

সন্ধ্যা হলো না। এখানে রাত নেই। শুধু এক অনন্ত দিনের আলো। রহমান একটা ফল তুলে খেল। স্বাদ এমন যে পৃথিবীর সব মিষ্টি জিনিস মনে পড়ে গেল, কিন্তু কোনো তুলনা হয় না। সে বসে পড়ল নদীর পাড়ে। দূরে কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে। কেউ গান গাইছে—

“এখানে আর কোনো বিচ্ছেদ নেই।

এখানে আর কোনো ভয় নেই।

এখানে শুধু আলো, শুধু প্রেম, শুধু চিরন্তন আনন্দ।”

রহমান চোখ বুজে বসল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সব কষ্ট যেন একটা দীর্ঘ স্বপ্ন ছিল। এখন সে জেগে উঠেছে।

এবং সেই জাগরণের নামই হলো স্বর্গ।

জান্নাত।

হেভেন।

যেখানে সব নাম এক হয়ে যায়।

যেখানে শুধু শান্তি থাকে।