মেয়েটা বড্ড ক্লান্ত ছিল… – জান্নাত মৃধা

Share

মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম ছিল। অন্য বাচ্চারা যখন পরিবারের কাছে আবদার করত, আদর চাইত, মন খারাপ হলে কারও বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদত, তখন মেয়েটা চুপচাপ নিজের কষ্টগুলো গিলে ফেলতে শিখেছিল। কারণ, সে খুব ছোটবেলাতেই বুঝে গিয়েছিল—সব শিশুর ভাগ্যে আদর জোটে না, সব কান্নার শব্দ কারও কানে পৌঁছায় না, আর সব পরিবারের কাছে তাদের সন্তানদের অনুভূতির মূল্য থাকে না।

এভাবেই সে বড় হয়েছে। বয়স বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু তার ভেতরের ছোট্ট মেয়েটা আজও সেই আগের জায়গাতেই আটকে আছে—একটু ভালোবাসা, একটু যত্ন আর কেউ একজনের মুখে “তুই ঠিক আছিস তো?” কথাটা শোনার অপেক্ষায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা বুঝতে শিখল, পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে শক্ত হতে হয়। তাই সে শক্ত হওয়ার অভিনয় করত। নিজের কষ্ট লুকিয়ে হাসত, চোখের জল মুছে স্বাভাবিক হয়ে যেত, হাজারটা সমস্যা মাথায় নিয়েও অন্যদের সামনে এমনভাবে থাকত, যেন তার জীবনে কোনো সমস্যাই নেই।

কিন্তু কেউ জানত না, প্রতিদিন রাতে বালিশে মুখ গুঁজে সে কতবার কেঁদেছে। কেউ জানত না, কতবার নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে বুঝিয়েছে—“আর একটু ধৈর্য ধর, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু সেই একদিন আর আসেনি।

বড় হতে হতে মেয়েটার কাঁধে এত দায়িত্ব জমা হলো যে, নিজের স্বপ্নগুলোকে নিয়ে ভাবার সময়টুকুও সে হারিয়ে ফেলল। সবার কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কথাই ভুলে গেল। কে কষ্ট পেল, কে ভালো আছে, কার কী প্রয়োজন—সব তার মনে থাকত। শুধু নিজের ভেতরটা যে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছিল, সেই খবর রাখার মতো কেউ ছিল না।

তারপর একদিন তার জীবনেও একজন মানুষ এসেছিল। এমন একজন, যার কাছে সে নিজের সমস্ত অভিমান, জমে থাকা কষ্ট আর লুকিয়ে রাখা কান্নাগুলো একটু একটু করে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল। যার সঙ্গে কথা বললে মনে হতো, এত দিনের ক্লান্ত জীবনে বুঝি একটু শান্তি ফিরে এসেছে।

মেয়েটা হয়তো প্রথমবারের মতো ভেবেছিল, এবার বুঝি তারও একটা আপন মানুষ হয়েছে। এবার বুঝি দিনের শেষে তারও কারও কাছে ফিরে যাওয়ার জায়গা আছে।

কিন্তু সব ভালোবাসা চাইলেই নিজের করে রাখা যায় না।

একসময় মেয়েটা সেই মানুষটাকেও নিজের ইচ্ছায় ছেড়ে দিল। ভালোবাসত না বলে নয়, অনুভূতি শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে নয়; বরং কখনো কখনো জীবনের পরিস্থিতি, অসহায়ত্ব আর নিজের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই মানুষকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যার কষ্ট সে কাউকে বোঝাতে পারে না।

মানুষটা হয়তো ভেবেছিল, মেয়েটা খুব সহজেই তাকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু কেউ কি জানত, কাউকে ছেড়ে দেওয়ার পরেও তাকে মনে মনে কতবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে? কেউ কি জানত, কিছু বিদায় মুখে বলা যায়, অথচ হৃদয় থেকে কোনো দিন মেনে নেওয়া যায় না?

এখন মেয়েটা একা।

তার চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু মনের কথা বলার মতো কেউ নেই। তার অনেক দায়িত্ব আছে, কিন্তু সেই দায়িত্বের ভারে সে কতটা নুয়ে পড়েছে, তা দেখার কেউ নেই। তার একটা হৃদয় আছে, কিন্তু সেখানে জমে থাকা কষ্টগুলো ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনো কাঁধ নেই।

দিনের পর দিন সে নিজেকে সামলে রাখে। কারণ, সে জানে—সে ভেঙে পড়লে তার দায়িত্বগুলো কেউ এসে তুলে নেবে না। তার কষ্টের জন্য পৃথিবী থেমে থাকবে না। তার চোখের জল দেখেও হয়তো কেউ জিজ্ঞেস করবে না, “কী হয়েছে তোমার?”

তাই সে কাঁদে চুপচাপ। হাসে প্রয়োজনের তাগিদে। কথা বলে স্বাভাবিকভাবে। আর প্রতিদিন নিজের ভেতরের মানুষটাকে একটু একটু করে হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু কেউ জানে না, মেয়েটা এখন আর আগের সেই মেয়েটা নেই।

কষ্ট পেতে পেতে একটা সময় তার অনুভূতিগুলো যেন মরে গেছে। যে মেয়েটা একসময় সামান্য অবহেলায় কেঁদে ফেলত, প্রিয় মানুষের একটু বদলে যাওয়ায় ভেতর থেকে ভেঙে পড়ত, সেই মেয়েটার চোখে এখন আর আগের মতো জল আসে না।

কান্না আসে, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে, গলায় কিছু একটা আটকে থাকে—তবু চোখ দিয়ে পানি পড়ে না। যেন চোখের পানিগুলোও তার কষ্টের কাছে হার মেনে নিয়েছে।

কখনো কখনো সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। এত কষ্টের পরেও সে কাঁদতে পারছে না কেন? এত কিছু হারানোর পরেও তার ভেতরটা শূন্য ছাড়া আর কিছু অনুভব করছে না কেন?

সে জানে না, কখন তার ভেতরের অনুভূতিগুলো এমন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু জানে, একসময় যে কষ্টগুলো তাকে কাঁদিয়ে দিত, এখন সেগুলোই তাকে অনুভূতিহীন করে দেয়।

মেয়েটা একজনই, অথচ তার ভেতরে যেন তিনটি আলাদা সত্তা বাস করে—তার মস্তিষ্ক, তার হৃদয় আর তার আত্মা।

তার হৃদয়টা এতবার আঘাত পেয়েছে যে, আর কোনো আঘাত সহ্য করার শক্তি যেন অবশিষ্ট নেই। সেই হৃদয় এখনো ভালোবাসতে চায়, কাউকে আঁকড়ে ধরে বলতে চায়, “আমাকে ছেড়ে যেয়ো না। আমি খুব ক্লান্ত, আমাকে একটু আগলে রাখো।”

কিন্তু মেয়েটার মস্তিষ্ক এখন আর তার হৃদয়কে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে দিতে চায় না।

কারণ, তার মস্তিষ্ক জানে—হৃদয়কে আবার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে দিলে, হৃদয় আবার কাউকে বিশ্বাস করবে, আবার কাউকে নিজের পৃথিবী বানাবে, আবার কাউকে হারানোর ভয়ে কাঁপবে। আবারও কারও প্রতি গভীর মায়া জন্মাবে, আবারও কাউকে হারানোর আশঙ্কায় প্রতিটা মুহূর্ত অস্থির হয়ে উঠবে।

আর সেই হৃদয় আবার ভেঙে গেলে তার সঙ্গে ভেঙে পড়বে মেয়েটার আত্মাটাও; যে আত্মা এত দিন ধরে সমস্ত কষ্ট নীরবে সহ্য করে এসেছে।

তাই মেয়েটার মস্তিষ্ক এখন তার হৃদয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। হৃদয়কে আর অবাধে অনুভূতিগুলোর পেছনে ছুটতে দিতে চায় না। কারণ, মস্তিষ্কটা জানে, হৃদয়ের প্রতিটা ভাঙনের মূল্য শেষ পর্যন্ত মেয়েটাকেই দিতে হয়।

মস্তিষ্ক যেন হৃদয়কে বলে দিয়েছে—

“আর না! অনেক হয়েছে। তুই আর কাউকে এতটা ভালোবাসতে পারবি না, কাউকে এতটা বিশ্বাস করতে পারবি না। কারণ, তোর প্রতিটা ভাঙনের সঙ্গে ওর আত্মাটাও একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। তুই আবার কাউকে নিজের পৃথিবী বানাবি, আর সেই পৃথিবী হারিয়ে গেলে ও আবারও অসহায় হয়ে পড়বে। এবার অন্তত ওকে বাঁচতে দে। তুই একটু থাম, এবার আমাকে ওকে সামলাতে দে।”

এখন মেয়েটার মস্তিষ্কই তার অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কাকে কতটা ভালোবাসতে হবে, কার কাছে কতটা প্রকাশ পেতে হবে, কোথায় অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হবে—সবকিছুতেই মস্তিষ্ক হৃদয়ের আগে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।

হৃদয়টা এখনো অনুভব করে, এখনো ভালোবাসতে চায়, এখনো কারও কাছে একটু আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু মস্তিষ্ক তাকে সেই অনুভূতিগুলোর কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে দেয় না।

কারণ, মস্তিষ্ক জানে, হৃদয় আবার ভেঙে গেলে শুধু হৃদয়টাই ভাঙবে না; তার সঙ্গে ভেঙে পড়বে সেই আত্মাটাও, যে এত দিন ধরে মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।

তাই মেয়েটার মস্তিষ্ক এখন হৃদয়কে আর মেয়েটার পুরো জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে দিতে চায় না। সে জানে, হৃদয়কে আবার অবাধে সবকিছু অনুভব করতে দিলে মেয়েটা হয়তো আবারও এমনভাবে ভেঙে পড়বে, যেখান থেকে নিজেকে সামলে তোলা তার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।

হৃদয়টা চুপচাপ নিজের ক্ষতগুলো বয়ে বেড়ায়। মস্তিষ্ক তাকে শক্ত থাকতে শেখায়। আর আত্মাটা প্রতিদিন একটু শান্তি পাওয়ার আশায় বেঁচে থাকে।

মেয়েটা এখন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২০ ঘণ্টাই সুখী থাকার অভিনয় করে।

সবার সামনে এমনভাবে হাসে, যেন পৃথিবীর কোনো কষ্টই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। এমনভাবে কথা বলে, যেন তার ভেতরে কোনো ঝড় নেই। এমনভাবে নিজেকে শক্ত করে রাখে, যেন তাকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কারও নেই।

মানুষও তাকে দেখে তাই ভাবে।

তারা ভাবে, মেয়েটা অনেক শক্ত। তার কিছুই হয় না। সে সবকিছু সামলে নিতে পারে। তাকে কষ্ট দেওয়া যায়, কিন্তু ভেঙে ফেলা যায় না।

কেউ বোঝে না, এই শক্ত মেয়েটা আসলে নিজের ভেতরের সমস্ত অনুভূতিকে মাটিচাপা দিয়ে বেঁচে আছে। ওই ২০ ঘণ্টা সে নিজের হৃদয়ের চিৎকার শুনতে পায় না, নিজের আত্মার কান্নার দিকে তাকায় না। কারণ, একবার অনুভূতিগুলোকে মুক্তি দিলে সেগুলো তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সে নিজেও জানে না।

আর বাকি চার ঘণ্টা?

সেই চার ঘণ্টায় মেয়েটা নিজেকে খুঁজে বেড়ায়।

নিজের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, সে আসলে কে। এত দায়িত্ব, এত অভিমান, এত না-পাওয়া আর এত হারানোর ভিড়ে তার নিজের অস্তিত্বটা কোথায় হারিয়ে গেল?

কিন্তু নিজেকে খুঁজতে গেলেই সে বারবার ভেঙে পড়ে।

কখনো অন্ধকার ঘরের এক কোণে বসে থাকে, কখনো বিছানায় মুখ লুকিয়ে চুপচাপ কাঁদে, আবার কখনো বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায়ত্ব নিয়ে ছটফট করে। তখন তার ভেতরের সেই ছোট্ট মেয়েটা আর চুপ থাকতে পারে না।

সে যেন চিৎকার করে বলে ওঠে—

“আমারও তো একটু ভালোবাসা দরকার ছিল! আমারও তো ইচ্ছে করত কেউ আমার কষ্টটা বুঝুক! আমিও তো চাইতাম, কেউ আমার মাথায় হাত রেখে বলুক, তোর আর একা লড়তে হবে না, আমি আছি!”

কিন্তু সেই চিৎকার শোনার মতো কেউ থাকে না।

অন্ধকার ঘরটা নীরব থাকে। দেয়ালগুলো নীরব থাকে। পৃথিবীটা নিজের মতো চলতে থাকে।

আর মেয়েটা?

সে নিজের মাথায় নিজেই হাত বুলিয়ে দেয়। নিজের চোখের জল নিজেই মুছে দেয়। নিজেকেই বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে।

তারপর নিজেকেই মিথ্যা আশ্বাস দেয়—

“কাঁদিস না, বোকা মেয়ে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস। একদিন তোরও ভালো সময় আসবে। একদিন তুইও একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারবি।”

কথাগুলো বলতে বলতে সে নিজেই জানে না, সে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, নাকি নিজের ভেতরের ছোট্ট মেয়েটাকে আরেকটা মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

কারণ, এত দিন ধরে সবকিছু সামলাতে সামলাতে সে নিজেও জানে না, আর কত দিন এভাবে বেঁচে থাকার অভিনয় করতে পারবে।

আর কত দিন নিজের কষ্টগুলোকে মাটিচাপা দিয়ে রাখতে পারবে।

আর কত দিন নিজের ভেতরের মানুষটাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে শান্ত রাখতে পারবে।

তবু সে প্রতিদিন বেঁচে থাকে। দায়িত্ব পালন করে, মানুষের সঙ্গে কথা বলে, হাসে, প্রয়োজন হলে অন্যদের সান্ত্বনা দেয়।

শুধু নিজের জন্য তার কোনো সময় থাকে না।

তবু এত কিছুর পরেও মেয়েটার ভেতরে একটুখানি আশা বেঁচে আছে।

সে এখন আর নিজের জীবনে নতুন কাউকে আনতে চায় না। কাউকে নিজের দুর্বলতার জায়গাগুলো দেখাতে চায় না। কাউকে নিজের পৃথিবীর অংশ করে আবার হারানোর ঝুঁকি নিতে চায় না।

কারণ, সে জানে হারানোর কষ্ট কেমন।

সে জানে, কাউকে নিজের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ভালোবাসার পর সেই মানুষটাকে ছেড়ে দেওয়া কতটা যন্ত্রণার। সে জানে, কাউকে নিজের শান্তির জায়গা বানিয়ে ফেলার পর সেই মানুষটাকে ছাড়া বেঁচে থাকার চেষ্টা কতটা কঠিন।

তাই এখন সে নিজেকে সবার কাছ থেকে একটু একটু করে সরিয়ে নিচ্ছে।

তার মনে হয়, সে যদি কাউকে নিজের জীবনে না আনে, তাহলে অন্তত আর কাউকে তার মতো কষ্ট পেতে হবে না।

সে ভাবে, তার জীবনে যে মানুষটা আসবে, সেও হয়তো তার মতো অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হবে। তার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে হয়তো সেই মানুষটাও এমন একটা জীবন পাবে, যেখানে ভালোবাসা থাকলেও শান্তি থাকবে না, অনুভূতি থাকলেও প্রকাশ করার সাহস থাকবে না, আর একসঙ্গে থেকেও দুজন মানুষ একে অপরের কাছে অসহায় হয়ে পড়বে।

মেয়েটা নিজের কষ্টের জন্য আর কাউকে কষ্ট দিতে চায় না।

তাই সে একা থাকাকেই বেছে নিয়েছে।

কিন্তু এই একা থাকার সিদ্ধান্তটা সে খুব সহজে নেয়নি। প্রতিটা রাতে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নিজের ইচ্ছেগুলোকে বোঝায়, নিজের ভালোবাসাকে নিজের হাতেই থামিয়ে দিয়ে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

আর সেই সিদ্ধান্তের আড়ালেও একটা ভয় লুকিয়ে আছে।

হারানোর ভয়।

আবার কাউকে ভালোবেসে ফেলার ভয়।

আবার কাউকে নিজের পৃথিবী বানিয়ে, একদিন সেই পৃথিবীটাকে হারিয়ে ফেলার ভয়।

তাই মেয়েটা এখন আর কাউকে চায় না বললেও, তার ভেতরের ছোট্ট মেয়েটা আজও চায় কেউ একজন তাকে বুঝুক। কেউ একজন তার নীরবতার ভাষা পড়ুক। কেউ একজন তার মুখের হাসি দেখে নয়, তার ভেতরের অবস্থাটা বুঝে তার পাশে বসুক।

কিন্তু সেই চাওয়াটুকুও সে নিজের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে।

কারণ, আশা করতে তার ভয় হয়।

আরেকবার আশাহত হওয়ার মতো শক্তি যে তার আর অবশিষ্ট নেই।

এখন মাঝেমধ্যে গভীর রাতে মেয়েটা আল্লাহর কাছে দোয়া করে।

তার দোয়াগুলো অন্যদের মতো নয়। সে আর খুব বেশি কিছু চায় না। বড় কোনো স্বপ্ন পূরণের আবদার করে না। কারও ভালোবাসা পাওয়ার জন্যও আর জোর করে কিছু চায় না।

সে শুধু বলে—

“আল্লাহ, তুমি তো আমার ভেতরের সবকিছু জানো। আমি কতটা ক্লান্ত, কতটা একা, কতটা ভেঙে গেছি—এসব কাউকে বোঝাতে পারি না, কিন্তু তোমার কাছে তো কিছুই লুকানো নেই।

আমি জানি না, আমার জীবনে আর কতটা কষ্ট বাকি আছে। জানি না, আর কত দিন এভাবে নিজেকে সামলে রাখতে পারব। শুধু একটা কথা বলি, আল্লাহ—যত দিন তুমি আমাকে এই দুনিয়ায় রেখেছ, আমার জীবনে আর কাউকে পাঠিয়ো না।

আমি একাই ঠিক আছি, আল্লাহ।

আমি নিজেকে সামলাতে শিখে গেছি। নিজের কান্না নিজে মুছতে শিখেছি। নিজের মাথায় নিজেই হাত বুলিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে শিখেছি। একা একা বেঁচে থাকার অভ্যাসটাও করে ফেলেছি।

আমি আর কাউকে চাই না।

কারণ, আমার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে আরেকটা মানুষও যদি আমার মতো কষ্ট পায়, সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। আমি চাই না, আমার জীবনের অন্ধকার আরেকটা মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়ুক।

তাই আমাকে একাই থাকতে দাও, আল্লাহ।

আমি আর কাউকে হারাতে চাই না। আর কাউকে ভালোবেসে নিজের ভেতরটাকে নতুন করে ভেঙে ফেলতে চাই না।”

এই কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।

কারণ, সে আসলে একা থাকতে চেয়েছিল বলে একা হয়নি।

সে একা হয়েছে, কারণ বারবার কষ্ট পেতে পেতে একসময় একাকিত্বকেই নিরাপদ মনে হতে শুরু করেছে।

সে কাউকে চাওয়া বন্ধ করেছে, কারণ তার চাওয়াগুলো পূরণ হয়নি।

সে ভালোবাসার আশা ছেড়ে দিতে চেয়েছে, কারণ ভালোবাসার সঙ্গে হারানোর ভয়টাও তার জীবনে জড়িয়ে গেছে।

আর এখন সে নিজের সমস্ত ইচ্ছেকে চেপে রেখে শুধু নিজেকে বোঝায়—সে একাই ভালো আছে।

অথচ তার হৃদয়ের গভীরে আজও একটা ছোট্ট মেয়ে বসে আছে, যে জানে না কেন তাকে এত তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যেতে হলো। কেন তাকে ছোটবেলা থেকেই নিজের কষ্ট নিজেকে সামলাতে হলো। কেন তারও অন্যদের মতো নির্ভয়ে কারও কাছে আবদার করার, অভিমান করার, একটু আদর পাওয়ার সুযোগ হলো না।

সেই ছোট্ট মেয়েটা আজও চায়, কেউ একজন তাকে বলুক—

“তোমাকে সব সময় শক্ত হতে হবে না। তুমি ক্লান্ত হতে পারো, তুমি কাঁদতে পারো, তোমারও মন খারাপ হতে পারে। তোমারও যত্ন পাওয়ার অধিকার আছে। তোমাকে সবকিছু একা সামলাতে হবে না।”

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মেয়েটা এখনো সেই কথাগুলোর অপেক্ষায় আছে।

আর অপেক্ষা করতে করতে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে।

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপারটা জানো কী?

মেয়েটা এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু নিজের সঙ্গে তার আর আগের মতো পরিচয় নেই।

তার মস্তিষ্ক তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার হৃদয় নীরবে ক্ষত বয়ে বেড়ায়, আর তার আত্মা প্রতিদিন একটু শান্তির জন্য অপেক্ষা করে।

সে মানুষের সামনে হাসে, কিন্তু নিজের কাছে ফিরে এলে আর বুঝতে পারে না, সে সত্যিই হাসতে জানে কি না।

সে সবাইকে বোঝায় যে সে শক্ত, কিন্তু নিজের ভেতরে প্রতিদিন সেই শক্ত থাকার অভিনয়ের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

সে নিজেকে বোঝায় যে তার আর কাউকে দরকার নেই, অথচ মাঝেমধ্যে তারও ইচ্ছে করে, কেউ একজন তাকে না বদলানোর শর্তে, কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই একটু বুঝুক।

সে বলে, সে একাই ভালো আছে। কিন্তু এই কথাটা বলতে তার কতটা কষ্ট হয়, তা শুধু তার হৃদয় আর আল্লাহ জানেন।

আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা প্রতিদিন নিজেকে একটা প্রশ্ন করে—

“আমি কি সত্যিই এতটা শক্ত হয়ে গেছি, নাকি কষ্ট পেতে পেতে অনুভব করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেছি?”

হয়তো উত্তরটা তার জানা নেই।

হয়তো সে এখনো নিজের ভেতরের সেই ছোট্ট মেয়েটাকে খুঁজছে, যে একসময় খুব সহজে হাসতে পারত, ছোট ছোট আনন্দে খুশি হতো, আর বিশ্বাস করত—একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু এতটুকু সে জানে, সে আর আগের মতো নেই।

কষ্ট তাকে বদলে দিয়েছে। দায়িত্ব তাকে ক্লান্ত করেছে। একাকিত্ব তাকে নীরব করেছে। আর বারবার নিজেকে সামলাতে সামলাতে সে নিজের কাছেই অচেনা হয়ে গেছে।

তবু সে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে।

আবার নতুন একটা দিন শুরু করে।

আবার সবার সামনে হাসে।

আবার নিজের অনুভূতিগুলোকে মাটিচাপা দেয়।

আর রাত হলে, যখন পৃথিবীটা একটু শান্ত হয়, তখন সে নিজের ভেতরের ছোট্ট মেয়েটাকে খুঁজতে বের হয়।

হয়তো একদিন সে তাকে খুঁজে পাবে।

হয়তো একদিন সে আবার নিজের জন্যও বাঁচতে শিখবে।

হয়তো একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে আর অচেনা মনে হবে না।

কিন্তু সেই দিনটা কবে আসবে, তা সে জানে না।

সে শুধু জানে, এত দিন ধরে সে অন্য সবার জন্য শক্ত থেকেছে।

এবার তার নিজের জন্যও একটু মায়া দরকার।

একটু শান্তি দরকার।

একটু এমন জীবন দরকার, যেখানে প্রতিটা দিন পার করার জন্য তাকে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে না।

কারণ, মেয়েটা আসলে কখনোই খুব বেশি কিছু চায়নি।

সে শুধু চেয়েছিল একটু ভালোবাসা, একটু যত্ন, একটু মানসিক শান্তি আর এমন একজন মানুষ, যার সামনে তাকে শক্ত থাকার অভিনয় করতে হবে না।

কিন্তু সেই সামান্য চাওয়াগুলো পূরণ করতে গিয়েই সে নিজের ভেতরের কতটা অংশ হারিয়ে ফেলেছে, তার হিসাব আজ আর তার কাছেও নেই।

আজ সে শুধু ক্লান্ত।

ভীষণ ক্লান্ত।

এতটাই ক্লান্ত যে, কখনো কখনো নিজের অনুভূতিগুলোকেও আর চিনতে পারে না।

তবু তার ভেতরের ছোট্ট মেয়েটা আজও বেঁচে আছে।

চুপচাপ।

অভিমান নিয়ে।

একটু ভালোবাসার আশায়।

আর সেই ছোট্ট মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই হয়তো বড় হয়ে যাওয়া মেয়েটা প্রতিদিন নিজেকে বোঝায়—

“আর একটু ধৈর্য ধর। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস।”

কিন্তু মেয়েটা কত দিন আর এভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বেঁচে থাকবে, সেই উত্তরটা আজও অজানা।

হয়তো পৃথিবীর কেউ কোনো দিন জানবেও না, একটা মেয়ে কতবার নিজের ভেতরে ভেঙে পড়ে আবার নিজেকেই জোড়া লাগিয়েছে।

কেউ জানবে না, কতবার সে নিজের কষ্টকে লুকিয়ে অন্য কাউকে হাসিয়েছে।

কেউ জানবে না, কতবার সে নিজের সব অনুভূতি চেপে রেখে শুধু দায়িত্বের জন্য বেঁচে থেকেছে।

কেউ জানবে না, কতবার তার ইচ্ছে হয়েছে কেউ একজন তাকে বুঝুক, অথচ কাউকে কিছু না বলেই সে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেছে।

পৃথিবী শুধু তার হাসিটা দেখবে।

তার শক্ত হয়ে থাকার অভিনয়টা দেখবে।

তার দায়িত্ব পালন করার ক্ষমতাটা দেখবে।

কিন্তু তার ভেতরে যে একটা ছোট্ট মেয়ে আজও একটু আদর, একটু আশ্রয় আর একটু নির্ভরতার জন্য অপেক্ষা করছে, সেই খবর হয়তো কেউ কোনো দিন রাখবে না।

কারণ, সবাই শক্ত মেয়েটাকে দেখতে পায়; কিন্তু সেই শক্ত মেয়েটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসহায় শিশুটাকে দেখার মতো চোখ সবার থাকে না।