তিন সন্তান ও স্ত্রী সাবেরাকে নিয়ে ভরা সংসার রাইসুল ইসলাম সাহেবের। এক মেয়ে মেধা, দুই ছেলে মাহাদী আর মুহিব। একমাত্র মেয়ে বলে দারুণ আহলাদী স্বভাবের মেধা। সারা দিন বাবার আদর খাওয়ার জন্য সুযোগ পেলেই বাবার পেছনে ঘুরঘুর করতে থাকে। ভাইবোনদের মধ্যে সে সবার বড়।
রাইসুল ইসলাম দীর্ঘদিন দেশের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ আবুধাবীতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। তখন সাবেরাকেও তার সঙ্গে আবুধাবীতে নিয়ে যান। সেখানেই দুই বছরের ব্যবধানে মেধা আর মাহাদীর জন্ম। সেখানে আট বছর পুরোদমে সংসার করার কিছুদিন পর মেধা, মাহাদীকে সঙ্গে আর মুহিবকে গর্ভে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন সাবেরা। তার পর রাইসুল সাহেবের বিদেশ থেকে পাঠানো টাকায় কেনা জমির পাশেই ভাড়া বাড়িতে থেকে লেবারদের সাহায্যে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় বেশ প্রশস্ত একটা তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করলেন সাবেরা আর বাড়িটির নাম দিলেন ‘আলো-ছায়া’। সত্যিই বাড়ির আশপাশের প্লটগুলো ফাঁকা হওয়ায় ‘আলো-ছায়া’তে প্রচুর আলো, বাতাস খেলা করে।
এরই মধ্যে পনেরো বছর কেটে গেল। রাইসুল ইসলাম একেবারে দেশে ফিরে এলেন। এখন বাড়িভাড়া আর স্টক এক্সচেঞ্জে খাটানো কিছু টাকায় সংসার চলছে। দেখতে দেখতেই মেধা বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠল। সে এখন ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বিকম পাস করেছে। পাত্রও ঠিক হয়ে গেছে। পাত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদে চাকরিরত শোয়েব আহমেদ। বাবা আসিফ আহমেদ ঢাকা ওয়াসার সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, মা রোকেয়া আহমেদ প্রাইমারি স্কুল টিচার আর ছোট ভাই শিহাব আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিষয়ে এমবিএ অধ্যয়নরত।
এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় বেশ ধুমধাম করেই শোয়েব আর মেধার শুভবিবাহ সম্পন্ন হলো। আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব মিলে প্রায় শ পাঁচেক লোকজনের উপস্থিতিতে খুব পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি অনুষ্ঠান হলো। খাবারের মেনু ছিল চমৎকার! সাদা পোলাও, দেশি মুরগির রোস্ট, চাইনিজ সবজি, খাসির ঝাল রেজালা, তেঁতুলের চাটনি, শাহি জর্দা আর কোল্ড ড্রিংক।
একমাত্র আপুর বিয়েতে একমাত্র জিজুর সঙ্গে অনাবিল আনন্দ করেছে মাহাদী ও মুহিব। মাহাদী কবি নজরুল কলেজ থেকে ম্যাথম্যাটিকসে অনার্স ও মাস্টার্স করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে অ্যাকাউনটেন্ট হিসেবে চাকরি করছে আর মুহিব নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে।
বিয়ের ছয় মাস পর শোয়েব ও মেধার জীবনে পরম আনন্দ বিরাজমান। মা হতে চলেছে মেধা। এই সুখবরে উভয় পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সুখ-আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না! গর্ভধারণের মাত্র দুই মাসের মাথায় এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ছাদের ভেজা সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মেধা। মুহূর্তের মধ্যেই যে ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্ব নিজের শরীরে অনুভব করেছিল সে তা নিঃশেষ হয়ে গেল- গর্ভপাত হয়ে গেল।
এ দুর্ঘটনায় দুই পরিবারের সবারই খুব মন খারাপ হয়ে গেল। মেধা কিছুতেই এ দুঃখ মেনে নিতে পারছে না। তাই শোয়েব ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মেধার মনটা প্রফুল্ল করতে হাওয়া বদলের জন্য তাকে নিয়ে অফিস থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গেল। শোয়েব যতটা সম্ভব মেধার কাছাকাছি রইল। এক মুহূর্তের জন্যও মেধাকে চোখের আড়াল হতে দেয়নি।
এদিকে মাহাদী পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন হুট করে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসে হাজির। বউমা, ভাবী সুমনাকে দেখে বাড়ির সবাই একদম হতবাক। ছেলের এ কাণ্ডে বড় অভিমান হলো সাবেরার। মাহাদী পেছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমার খুব ভুল হয়ে গেছে মা, আমাদের ক্ষমা করে দাও প্লিজ!’ মা কি আর সন্তানের ওপর রাগ করে থাকতে পারে! মেধা কক্সবাজার থেকে ফিরে এলে স্বল্প পরিসরে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গুটিকয়েক আত্মীয়-বন্ধুদের উপস্থিতিতে মাহাদী আর সুমনার বউভাত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল।
তবে নিগূঢ় ভালোবাসা থাকলেও ছোট্ট ভুল বোঝাবুঝি সুন্দর সম্পর্কে মরীচিকা ধরিয়ে দেয়। মাহাদীর কাজের জায়গার সহকর্মী রিয়া প্রায়শই রাত-বিরাতে মাহাদীকে ফোন করে অনেকক্ষণ আলাপচারিতা চালায়। বিষয়টি সুমনাকে ভাবিয়ে তোলে। একদিন সুমনা ভাবল মাহাদীর অফিসে গিয়ে ওকে সারপ্রাইজ দেবে আর দুজনে একসঙ্গে লাঞ্চ করবে। কিন্তু অফিসে পৌঁছে জানতে পারে মাহাদী রিয়ার সঙ্গে একটু আগেই লাঞ্চ করতে বেরিয়েছে। তখন সুমনা খুব কষ্ট পায় আর বাসায় ফিরে যায়।
এরপর সেদিন সন্ধ্যায় মাহাদী বাসায় ফিরলে সুমনা বলল, ‘আমি আগামীকাল আমার গ্রামের বাড়ি চলে যাচ্ছি। আমাদের পথচলা এতটুকুই ছিল।’ মাহাদী অনেক বোঝাবার চেষ্টা করল। কিন্তু সুমনা তার সিদ্ধান্তে অনড়।
আজ প্রায় এক বছর হয়ে গেল। মাহাদী আর সুমনার মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে ছয় মাস আগে। এর মধ্যে মুহিব বিকম পাস করে বাসার কাছের একটা স্কুলে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছে।
পারিবারিকভাবে মাহাদী গেল শুক্রবার মিতুর সঙ্গে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু এ বিয়ে মাহাদীর জন্য একটা সমঝোতাই বটে। প্রকৃত অর্থে ভালো সে সুমনাকেই বেসেছিল। কিন্তু নিয়তিতে তাদের বিচ্ছেদ লেখা ছিল। মাহাদীর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতে মুহিব তার জীবনে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিল।
অবশেষে মেধা আবার গর্ভবতী হলো। তবে এবার খুব সতর্কতার সঙ্গে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলল। প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের পর গর্ভ রক্ষার জন্য মহান আল্লাহতায়ালার নাম ‘ইয়া রাকিবু’ পাঠ করল। সন্ধ্যাবেলায় একা একা ছাদে যায় না, সঙ্গে ছোট্ট একটা ব্যাগে দুই কোয়া রসুন, একটি রুপোর আংটি রাখল। দীর্ঘ নয় মাস অপেক্ষার পর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। মেধার কোল আলো করে এই সুন্দর, শস্য-শ্যামলা ধরণীতে এল শোয়েব ও মেধার ফুটফুটে কন্যাসন্তান তুষ্টি।
প্রথম সন্তানকে হারিয়ে জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছে মেধা। এখন আর পেছনে ফিরে তাকাতে চায় না সে। শোয়েব আর তুষ্টিকে নিয়ে বাকি জীবনটা হেসে-খেলে আনন্দে কাটাতে চায় মেধা।
আর এভাবেই মধ্যবিত্ত সাধারণ পরিবারের সদস্যদের জীবনকথা এভাবেই সম্মুখে এগিয়ে যায়।
সূত্র: খবরের কাগজ/নাদিয়া নওশাদ