প্রেম সোহাগী পান আর মানুষ সোহাগী বারী ভাই – মোঃ মজনু সরকার

Share

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত গভীর হতে শুরু করেছে। শহরের কোলাহল পেরিয়ে, রাতের নিস্তব্ধতা উপভোগের সাথে সাথে, বগুড়ার সবচাইতে পুরোনো পানের দোকানের বাহারি পান খাওয়ার জন্য আমাদের গাড়িটা আঁকাবাঁকা গ্রামীন পথ মাড়িয়ে বেহুলা লখিন্দরের বাসর ঘর খ্যাত গোকুলের দিকে ছুটছে। আমাদের বহনকারী গাড়ি যখন বাসরঘরের সামনে গিয়ে থামলো তখন রাত ৭ঃ৩০ টা ছুঁইছুঁই। পানের দোকানে সামনে গিয়ে দেখলাম, ছোট্ট একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে মায়াবী চেহারার একজন মাঝ বয়সি মানুষ আপন মনে একটি কাঠের পিঁড়িতে নানা রকমের মশলা দিয়ে বাহারি পান সাজাচ্ছে। গাকের রাশেদের নিমন্ত্রণে এই বাহারি পানের কারিগর বারী ভাইয়ের সাথে পরিচিতি হই এবং পাশে বসে, তার হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি দুখিলি পান চিবাতে চিবাতে কথা হয় তার সাথে।

আলাপচারিতায় জানতে পারি আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে জীবিকার প্রয়োজনে তিনি এই পান বানানোর ব‍্যবসায় আসেন। প্রথম দিকে তিনি প্রায়শই ইন্ডিয়াতে গিয়ে বিভিন্ন মসলা দিয়ে পান তৈরির কলাকৌশল শিখতেন এবং ফেরার পথে পান তৈরির বিভিন্ন মসলা সঙ্গে নিয়ে আসতেন। এইভাবে তিনি নানা রকম মসলা দিয়ে বাহারি পান বানানোর কৌশল রপ্ত করেন। সেই কলা কৌশল ব‍্যবহার করে আজ তিনি পান বানানোকে একটি শৈল্পিক পযায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি দাবি করেন বগুড়ায় তিনিই সবপ্রথম নানা মসলা দিয়ে বাহারি পান বানিয়ে বিক্রির উদ‍্যোগ নিয়েছেন। বর্তমানে তার দেখাদেখি শুধু গোকুল মেথ (বেহুলা লখিন্দর বাসর ঘর) খ‍্যাত মহাস্থানগড় অঞ্চলে শতাধিক লোক এই ব্যবসায় জড়িত হয়েছেন এবং তার কাছ থেকে পান বানানোর কৌশল শিখে বগুড়া জেলাসহ আশেপাশের জেলায় হাজারো মানুষ পান বানানোকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। তিনি আরো জানান, বগুড়া শহরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকতা থেকে শুরু করে বেসরকারি পর্যায়ের কমকর্তা, বহু রাজনৈতিকবিদ, শিক্ষাবিদ, গনমান‍্য ব‍্যক্তি, স্কুল ও কলেজগামী ছাত্রছাত্রী এবং সমাজের প্রায় সকল স্তরের মানুষ তাঁর হাতের বানানো পান খেয়ে গেছেন এবং তাদের মধ‍্য হতে অনেকে বতর্মানে স্থায়ী কাষ্টমারে পরিণত হয়েছেন। এছাড়া বগুড়া শহরের প্রায় প্রতিটি কমিউনিটি সেন্টার, করপোরেট অফিস, বিয়ে-সাদী অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত পান সরবরাহ করেন। বতমানে প্রতিদিন গড়ে তার ১০০০-১৫০০ পান বিক্রি হয়। তার দোকানে প্রতি পিস পান সবোর্চ্চ ১০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ৫ টাকা দামে বিক্রি হয়ে থাকে, তবে ২০-২৫ টাকা দামের পান সবচাইতে বেশি বিক্রি হয়। হাতে বানানো পান বিক্রি থেকে তার মাসিক গড়ে লক্ষাধিক টাকা লাভ হয়ে থাকে।

তিনি আরো জানান, তিনি একাধিক বার ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা থেকে সেরা পান বিক্রেতা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। এই পান বিক্রির সাথে তার বিয়ে, সন্তানের জন্ম, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত টিকে থাকা সকল কিছুই জড়িত রয়েছে। জীবনের সেই হৃদয় স্পর্শ করা গল্পগুলো বলতে বলতে তার নিপুণ হাতে তৈরি আগুনমুখো পান ও প্রেম সোহাগী পান আমাকে খাইয়ে দিলেন। পান খাওয়া অপছন্দ করা এই আমি তার জোড়াজুড়িতে জীবনে প্রথমবারের মতো দুটো পান একসাথে খেলাম। পান খাওয়ার পর মনে হয়েছে জীবনে এর চেয়ে সুস্বাদু পান দ্বিতীয়টি খাইনি। বারী ভাইয়ের হাতের তৈরি এই পানের বিশেষত্ব হলো : তার দোকানে বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত প্রায় ২৮৮ ধরনের মশলা দিয়ে ১০ ধরনের ১০ নামের ১০ স্বাদের পান তৈরি করা হয় , যা মুখে দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে নরম হয়ে যায়, অসাধারণ স্বাদ অনুভব হয়, খাওয়ার পর জিহ্বার পাতায় আস্তর পড়ে না এবং পানে কোনো ঝাঁঝালো ঝাঁঝ থাকে না, ফলে একসাথে যে কোনো বয়সের মানুষ একাধিক পান খেতে পারে। তার দোকানে প্রেম সোহাগী পান ১০০ টাকায়, বৌ-সোহাগী পান ৮০টাকা, স্বামী সোহাগী পান ৬০ টাকা, হীরা-মণি পান ৫০ টাকা, মধু-মালতী পান ৪০ টাকা প্রীতিরস পান ৩০ টাকা, আগুন পান ২৫ টাকা, শাহী পান ২০ টাকা, নবাবী কস্তুরী পান ১০ টাকা এবং স্টার পান ০৫ টাকায় দামে বিক্রি হয়।

বগুড়াতে আসলে অবশ্যই এই পান খেতে ভুলবেন না কারণ বগুড়ার এশিয়ার দইয়ের মতো বারী ভাইয়ের এই পানও অত্যন্ত সুস্বাদু এবং অত্যন্ত জনপ্রিয়। একবার খেলে বার বার খেতে মন চাইবে। এই পান খেতে যেতে হবে বগুড়ার মূল শহর থেকে ৮-১০ কিলোমিটার দুরে গোকুলের বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘরের সামনে। আর অর্ডার দিতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন এই ০১৭১১-৬১০৭০৫, ০১৯২০-১৮৫৬৫০ মোবাইল নম্বর দুটোতে।
রাত ঘনিয়ে এসেছে, চারিদিকে রাতের নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, শীতের কুয়াশায় রাস্তাগুলো ঢেকে গেছে, টুপটাপ কিছুটা শিশির পড়া শুরু করেছে, অগত্যা হোটেলে ফেরার তাড়া আবারও ব্যস্ত শহরে দিকে ছুটতে থাকলাম। যদিও বারী ভাইয়ের পানের দোকানটা পিছনে ফেলে আসলাম কিন্তু মুখে অমৃতের মতো লেগে থাকা তার পানের স্বাদ আর বারী ভাইয়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ, প্রান্তবন্ত আচরণ, আপন করে নেওয়ার আন্তরিকগুলো বুক পকেটে জমে করে রেখে দিলাম। ভালো থাক বারী ভাইয়ের মতো সব অসাধারণ মানুষগুলো, বেঁচে থাক তাদের অসাধারণ কমগুলো এবং দেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে গড়ে উঠুক এই ধরনের ছোট ছোট শিল্পগুলো, যাঁদের মাধ্যমে সৃষ্টি হোক অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান।

২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
বগুড়া।