স্যরি’র চক্কর

Share

সেদিন অফিস থেকে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল আনিস সাহেবের। তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নামতে গিয়ে এক বিশালদেহী ভদ্রলোকের পায়ে পাড়া দিয়ে বসলেন। ভদ্রলোক চোখ-মুখ লাল করে যেই না খেঁকিয়ে উঠতে যাবেন, আনিস সাহেব অমায়িক হেসে দুই হাত জোড় করে বললেন, “আই অ্যাম রিয়েলি সরি ভাই! অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি।”

আনিস সাহেবের এমন বিনীত ‘সরি’ শুনে ভদ্রলোকের রাগ মুহূর্তেই পানি হয়ে গেল। তিনি হেসে বললেন, “আরে না না, ঠিক আছে। ব্যাপার না!”

আনিস সাহেব মনে মনে ভাবলেন, ‘বাঃ! সরি শব্দটার তো দারুণ পাওয়ার! একটা মাত্র শব্দে এত বড় মারকুটে লোকটাও ঠান্ডা হয়ে গেল!’ ব্যাস, সেই থেকে আনিস সাহেব ঠিক করলেন—জীবনে যাই ঘটুক, ঝটপট ‘সরি’ বলে পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, অতিরিক্ত ‘সরি’ বলা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে।

পরদিন সকালে আনিস সাহেব তার স্বভাবসুলভ তাড়াহুড়ো নিয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন। গলির মোড়ে এক কাঁচামাল বিক্রেতার ভ্যানের সাথে তার হালকা ধাক্কা লাগল। কয়েকটা আলু আর বেগুন রাস্তায় পড়ে গেল। বিক্রেতা রেগে লাঠি তোলার আগেই আনিস সাহেব চট করে বুক পকেটে হাত দিয়ে একটা দশ টাকার নোট বের করে বিক্রেতার হাতে দিয়ে বললেন, “অত্যন্ত দুঃখিত ভাই, একদম খেয়াল করিনি। ভেরি সরি!”

বিক্রেতা নোটটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হা করে রইল। তারপর বলল, “স্যার, আলু-বেগুনের তো কিছু হয় নাই, কিন্তু আপনার পকেট থেকে যে পঞ্চাশটা টাকা পইড়া গেছিল, হেইডা কুড়ায়া দিতে আইছিলাম। তা আপনি যখন সরি বইলা দশ টাকা জরিমানা দিলেনই, তাইলে বাকি চল্লিশ টাকা আমি রাখলাম!”

আনিস সাহেব হা করে চেয়ে রইলেন। নিজের ভালোমানুষি দেখাতে গিয়ে উল্টো চল্লিশ টাকা লস!

তবে আসল বিপর্যয় ঘটল সেদিন সন্ধ্যায়, নিজের বাসায়।

সারাদিনের খাটুনি শেষে আনিস সাহেব যখন বাড়ি ফিরলেন, দেখলেন তার স্ত্রী নীলা ড্রয়িংরুমে গম্ভীর মুখে বসে আছেন। থমথমে পরিবেশ। আনিস সাহেব জুতো খুলতে খুলতে ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোনো কারণে নীলা রেগে আছে। এখন কোনো যুক্তি-তর্ক না করে জাদুকরী শব্দটা প্রয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

তিনি ঘরে ঢুকেই একদম কান ধরে বললেন, “নীলা, প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আমি সত্যিই খুব সরি!”

নীলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “সরি মানে? কেন সরি?”

আনিস সাহেব ভাবলেন, স্ত্রীরা তো সাধারণত হাজারটা কারণে রেগে থাকে—হয়তো বাজার আনতে ভুলে গেছেন, নয়তো বিবাহবার্ষিকীর ডেট (যা তিনি কখনোই মনে রাখতে পারেন না)। তাই তিনি বানিয়ে বানিয়ে বললেন, “আসলে ওই যে তুমি সকালবেলা একটা কাজ করতে বলেছিলে না? ওটা একদম ভুলে গেছিলাম। আই অ্যাম সো সরি…”

নীলার চোখ এবার মার্বেলের মতো বড় বড় হয়ে গেল। সে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি সকালে তোমাকে কোনো কাজই করতে বলিনি আনিস! তার মানে তুমি অন্য কোনো অপরাধ করেছ, যা আমার কাছ থেকে লুকাতে চাচ্ছ!”

আনিস সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন, “না… মানে… আসলে…”

“আসলে কী?” নীলা এবার জেরা শুরু করল, “কাল রাতে তোমার ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছিল ‘হাই’। আমি জিজ্ঞেস করায় বলেছিলে রং নাম্বার। এখন বুঝতে পারছি! তুমি আসলে ওই মেয়ের সাথেই চ্যাট করছিলে, তাই না? সেই অপরাধবোধ থেকেই বাড়ি ঢুকে আগ বাড়িয়ে সরি বলছ!”

“আরে না নীলা! খোদার কসম, আমি তো শুধু…” আনিস সাহেব আমতা আমতা করতে লাগলেন।

“কোনো কথা শুনব না! চোরের মনে পুলিশ! তুমি নির্ঘাত কোনো আকাম করেছ, তাই এসেছ সরি বলতে!” নীলা সোজা বেডরুমে গিয়ে ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।

সেদিন রাতে আনিস সাহেবের কপালে আর ড্রয়িংরুমের সোফা ছাড়া অন্য কোথাও জায়গা হলো না। মশার কামড় খেতে খেতে তিনি কপালে হাত দিয়ে ভাবলেন, ‘মানুষ ভুল করলে সরি বলে মাফ পায়, আর আমি না বুঝে সরি বলে ফেঁসে গেলাম!’

সেই থেকে আনিস সাহেব প্রতিজ্ঞা করেছেন, জীবনে আর যাই হোক—বিনা অপরাধে আর কাউকে ভুলেও ‘সরি’ বলবেন না!