সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডে গত কয়েকদিন ধরে বারবার ভেসে উঠছে একটি গান—‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে…’। কেউ নিজের ছবি, কেউ ভিডিও, আবার কেউ কোনো বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন এই গান। সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে ঘিরে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনার প্রতিবাদ ও সংহতি প্রকাশে শিক্ষক, শিল্পী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গানটি ব্যবহার করছেন। আর সেই সূত্রেই নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও আলোচনায় এসেছে ব্যান্ড ডিফ্রেন্ট টাচ এবং এর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মেসবা রহমান।
মজার বিষয় হলো, বহুল জনপ্রিয় ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ গানটির জন্মও হয়েছিল এক বর্ষার রাতে। ১৯৮৭ সালে নতুন অ্যালবামের জন্য শেষ একটি গানের প্রয়োজন ছিল। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টির মধ্যে গীতিকার আশরাফ বাবুর মাথায় আসে গানের প্রথম লাইন। সেই রাতেই লেখা হয় পুরো গানটি, যা পরবর্তী সময়ে ডিফ্রেন্ট টাচের পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
গানটি নতুন করে আলোচনায় আসায় সম্প্রতি নিজের অনুভূতির কথা জানিয়েছেন মেসবা রহমান। তিনি বলেন, মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ডিফ্রেন্ট টাচের একটি গান নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে—এটি তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ বিভিন্নভাবে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তবে সংশ্লিষ্ট ভিডিওতে তিনি আপত্তিকর কিছু দেখেননি। বরং গানটি সংহতি ও সহমর্মিতার প্রতীক হয়ে উঠেছে বলেই তিনি মনে করেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে ডিফ্রেন্ট টাচের শুরুর দিনের স্মৃতিও তুলে ধরেন এই শিল্পী। তিনি জানান, বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক ঈদের অনুষ্ঠানে প্রথমবার পরিবেশিত হয়েছিল ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’। সেই সময় ছিল অ্যালবামের স্বর্ণযুগ। বিটিভিতে প্রচারের পরই দর্শকের নজরে আসে ব্যান্ডটি, আর অ্যালবাম প্রকাশের পর গানটি দ্রুত দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
গানটিকে ঘিরে রয়েছে অনেক স্মৃতিও। মেসবা রহমান জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্টে গানটি শুরু হতেই হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি নেমে আসে। দামি বাদ্যযন্ত্র রক্ষার জন্য অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হয়। পরের বছর আবার একই মঞ্চে আমন্ত্রণ পেয়ে একই গান শুরু করার পরও কাকতালীয়ভাবে নেমে আসে বৃষ্টি। ঘটনাটি আজও তার কাছে আনন্দময় স্মৃতি হয়ে আছে।
দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কনসার্টে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ পরিবেশন করলেই দর্শকদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে বলে জানান মেসবা। অনেক সময় তিনি পুরো গান শেষ করার আগেই দর্শক-শ্রোতারাই একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন। তার মতে, একজন শিল্পীর জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর হতে পারে না।
গানটির দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু কথা বা সুর নয়, সংগীতায়োজনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন মেসবা রহমান। তার ভাষায়, গানের শুরুতেই গিটারের যে পরিচিত সুর শোনা যায়, সেটিই শ্রোতার মনে আলাদা আবেগ তৈরি করে। ভালো কম্পোজিশন না হলে অনেক ভালো গানও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে না।
বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন এই সংগীতশিল্পী। সম্প্রতি গাজীপুর, কুমিল্লা, খুলনা ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট করেছেন। এছাড়া সংসদ ভবনে আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্ট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন।
নতুন গান নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান মেসবা রহমান। ইতোমধ্যে কয়েকটি নতুন গান মঞ্চে পরিবেশন করা হয়েছে এবং সেগুলোও শ্রোতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে। তার বিশ্বাস, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’, ‘দৃষ্টি প্রদীপ’ কিংবা ‘মন কী যে চায়’-এর মতো নতুন গানগুলোও একদিন শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেবে।
তিনি জানান, স্টুডিওতে নতুন গানের শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে। এবার শুধু অডিও নয়, ভিডিওসহ নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল থেকেই গানগুলো প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুতে একক গান প্রকাশ করা হলেও পরবর্তীতে একাধিক গান নিয়ে বিশেষ আয়োজনের ইচ্ছা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানটিকে ঘিরে নতুন করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্ব হিসেবেও দেখছেন মেসবা রহমান। তার বিশ্বাস, নতুন প্রজন্ম আবারও ডিফ্রেন্ট টাচের গান খুঁজে নিচ্ছে। সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই খুব শিগগিরই নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে হাজির হতে চান তিনি।