আকাশ জুড়ে মেঘের দাপাদাপি , বাতাসে মন্থর গতি। মেঘশাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা পরে টুকটুকে লাল সূর্যটা ডুবতে বসেছে । লক্ষী কুপি জ্বালাতে গিয়ে দেখে -কুপিতে কেরোসিন নেই ।
বৃষ্টি- বাদলের দিন কখন আকাশ ভেঙে অঝোরে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করবে ,বলা মুশকিল । দু’চালা টিনের খুপড়ি ঘর । ঘরটিতে এক সময় নগেনের ঠাকুরদাদা থাকতেন । তারপর পালাক্রমে নগনের বাবা ।নগেন পেয়েছে তাঁর বাবার কাছ থেকে । ঘরের চালের টিনগুলোর এখন বুড়ো বয়স ।
জং ধরে ফুটো হয়ে একদম বেহাল অবস্থা । একবার ঘরের চালের ফুটো টিনগুলো বদলাতে অনেক কষ্টে ত্রিশ হাজার টাকাও জমিয়েছিলো নগেন । বড় মেয়েটার পেটের টিউমার অপারেশন করাতে পুরো টাকা টা খরচ হয়ে যায় । তারপর শত চেষ্টা করেও কোন টাকা জমাতে পারেনি সে ।বৃষ্টি হলে ছেলে মেয়ে নিয়ে বিছানা পত্র গুটিয়ে বসে থাকতে হয় । কুপি না থাকলে কোথায় জল পড়ে কী ভিজে যাবে কিচ্ছুটি ঠাহর করা যাবে না । ছোট মেয়েটাও আবার আন্ধার দেখে ভয় পায় । তাই লক্ষী দ্রুত পা চালায় ছোট্ট একটা প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে, পাশের বাড়ির ফঁচুর মায়ের কাছ থেকে কেরোসিন ধার করতে ।
অভাব অনটনের সংসার স্রোতধারায় নগেনের ভালোবাসার খড়কুটো আকড়ে ধরে বহাল তবিয়তে ভেসে আছে লক্ষি ।ওদের সংসারে ভালোবাসার কোন অভাব নেই । সেই যে কিশোরী বেলায় নগেনের হাত ধরে এ’ভিটেয় পা রেখেছিলো লক্ষী । সেই থেকেই এ’ ভিটের সাথে নগনের সাথে নিজেকে আষ্টে পিষ্টে বেঁধে নিয়েছে সে ।
নগেন নানা রকম মাটির জিনিস বানায় । এক সময় ভালই আয় হতো । প্লাস্টিকের প্রাত্র বাজারে আসার পর থেকে আস্তে আস্তে মৃৎপাত্রের কদর কমতে শুরু করেছে। প্রাচীনকাল থেকে বংশানুক্রমে গড়ে ওঠা আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। সময়ের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন বিলীন হতে চলেছে এ’শিল্প । আয় কম হলেও বাপ, দাদার কাছ থেকে শেখা কাজ ছাড়তে পারে না নগেন।নগেন , লক্ষী দুজনে মিলেই মাটির জিনিস বানায়। ছেলে মেয়েরাও হাতে হাতে মা বাবাকে সাহায্য করে ।
উঠোন জুড়ে ছড়ানো ছিটানো মাটির পাত্র । সন্ধ্যের পর এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে ।মাটির পাত্রে জল জমে আছে ।বৃষ্টিধোয়া শীতল বাতাস হুড়মুড় করে ডুকে পড়ছে লক্ষীর খুপড়ি ঘরের ছোট্ট জানালা দিয়ে । ছেলে মেয়েরা গভীর ঘুমে । মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঁকি দিয়েছে। প্রকৃতি জুড়ে জ্যোৎস্নার মাখামাখি । নগেন জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় । অবাক করা চাঁদটা যেন জানলা দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল চোখে ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে । নগেন খাটো স্বরে লক্ষীকে ডাকে –
-“এই …বউ দেখ দেখ আকাশে কেমন ফকফকা চান্নি উইঠছে। চল বাইরে গিয়্যা চান্নি দেহি ।
লক্ষি আহ্লাদের স্বরে বলে
-” চান্নি দেইখবার যাইবার পারি , এক শর্তে !
-” আইচ্ছা !!! ক দেহি তোর শর্ত খান কী ?
-” তুমি যদি দাওয়ায় বইস্যা সুন্দর একখান গান হুনাও
লক্ষীর হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে নগেন বলে চল হুনামো নে! মাথার ওপর অবাক করা চাঁদ ঝুলছে, নগেনের কাঁধের ওপর লক্ষীর মাথা । নগেন গাইছে লক্ষীর প্রিয় গান ।দুজন বসে বসে চাঁদ দেখছে । সামনেই ছড়ানো ছিটানো মাটির পাত্রে ঝলমল করছে জ্যোৎস্না সুধা । আহা !আমার মতো সুখী মানুষ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টিও নেই ,লক্ষী বিড়বিড় করে একাই ।