গতকাল পহেলা নভেম্বর ছিল জনপ্রিয় অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর মেয়ের একটি আবেগঘন লেখা:
প্রিয় বাবা,
আজ তোমার ৮০তম জন্মদিন। সত্যি বলতে, তোমাকে কী বলব, তা আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। সারাটা দিন ধরে মানুষ তোমাকে নিয়ে কত সুন্দর সুন্দর কথা লিখেছে, সেগুলো পড়েছি। পড়তে পড়তে গর্বে আমার বুক ভরে উঠেছে। আবার একই সঙ্গে গভীর কষ্টও অনুভব করেছি এই ভেবে যে, আজকের এই বিশেষ দিনে তুমি একা।
আমি সবাইকে বলতে চাই, তুমি তোমার ভক্তদের কতটা ভালোবাসতে। কত ধৈর্য ধরে প্রত্যেকের অটোগ্রাফে স্বাক্ষর করতে, প্রতিটি ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে দাঁড়াতে—এমনকি যখন তুমি ভীষণ ক্লান্ত থাকতে, তখনও।
তুমি সব সময় বলতে, জনসমক্ষে তোমাকে কখনো তারকা হিসেবে তুলে ধরতে নেই। কারণ এই খ্যাতি, এই সন্মান তোমার একার নয়, তোমার ভক্তদেরও। তারাই তোমাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
তোমার নির্বাচনী এলাকা নীলফামারীতে তোমাকে কত পরিশ্রম করতে দেখেছি। মানুষের জন্য কি অগাধ ভালবাসা তোমার! সেখানে নার্সিং কলেজ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কলেজ প্রতিষ্ঠা করা তোমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন, অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা তহবিল গঠন—এসব কাজ তুমি কত আন্তরিকতার সঙ্গে করতে।
এমনকি তোমার শৈশবের বাড়িটি ছাড়া সেখানে তোমার যে একমাত্র জমিটুকু ছিল, সেটিও তুমি দান করে দিয়েছিলে। কারণ তোমার ভীষণ ইচ্ছা ছিল, তোমার জন্মভূমিতে একটি হাসপাতাল গড়ে উঠুক। তুমি আমাকে সবসময় বলতে, ভালো কাজ নীরবে করতে হয়। কাজ করার পর যদি তা নিয়ে বড়াই করো, তাহলে সেই কাজ আর মানুষের জন্য থাকে না, নিজের স্বার্থেই করা হয়।
ছোটবেলায় তুমি আমার কত ভালো বাবা ছিলে। রাতে ঘুম না এলে কীভাবে আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে, আঙুল দিয়ে আমার চুলে বিলি কেটে দিতে। যখন আইসক্রিম খাওয়া আমার জন্য নিষেধ ছিল, তখনও মাকে না জানিয়ে চুপি চুপি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াতে। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার কথা থাকলেও তোমার প্রিয় সিনেমা তোমার সঙ্গে বসে দেখার সুযোগ করে দিতে।
আমার বিয়ের দিন তুমি কতটা কেঁদেছিলে আমি জানি! বিয়ের পর আমি বাড়ি এলে, তুমি নিজে বাজারে গিয়ে আমার পছন্দের মাছ কিনে আনতে। আমার স্বাধীনতাকে তুমি সব সময় সম্মান করেছ, অথচ ভালোবেসেছ ঠিক তোমার সেই ছোট্ট মেয়েটির মতো করেই।এসব কথা লিখতে গেলে আমার চোখে জল চলে আসে।
বাবা তুমি তো আমাকে শিখিয়েছিলে শক্ত হতে, জীবনে যত বাধাই আসুক না কেন, সব সময় মাথা উঁচু করে বাঁচতে। শক্ত আর হতে পারি কই! গত দুই বছর ধরে তুমি আমাকে অসংখ্যবার বলেছ সাহসী হতে, নিজের জীবনকে বাঁচতে, যতটা সম্ভব সুখী ও আশাবাদী থাকতে। কিন্তু হায় প্রতিটি দিন যেন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
তবুও আজ আমি তোমার জন্য আশাবাদী থাকতে চাই। আমি আশা করি, ন্যায়বিচারের জয় হবে। যারা অপরাধী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং যারা নির্দোষ, তারা মুক্তি পাবে। আমি আশা করি, প্রতিহিংসার ওপর মানবিকতার জয় হবে, আর কুসংস্কার ও পক্ষপাতের ওপর জয়ী হবে যুক্তিবোধ।
আমি স্বপ্ন দেখি, কোনো একদিন আবার বাড়ি ফিরে তোমার পড়ার ঘর থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শুনতে পাব। উঁকি দিয়ে দেখব, তুমি তোমার সেই চিরচেনা জায়গায় বসে আপন মনে তোমার প্রিয় কবিতাগুলো আবৃত্তি করছ। আর তোমার পায়ের কাছে বসে সুন্দরী (Shundori) লেজ নাড়ছে।
সেদিন হয়তো আমি আবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারব। বুক ভরা হাহাকার নিয়ে আমরা সেই দিনের প্রতীক্ষায় বসে আছি!
শুভ ৮০তম জন্মদিন, বাবা। তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি আর মিস করি! ❤️❤️
~ সুপ্রভা তাসনীম
(আসাদুজ্জামান নূরের কন্যা)