কিছু মায়া তবু রহিয়া গেল – নুরুজ্জামান লাবু

Share

লিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় ভিনতিমিগলিয়ার একটা গ্রোসারি শপে। ইতালীর সীমান্তবর্তী এবং সমুদ্রতীরের একটি শহর। গ্রোসারি শপে একটু খাবার কিনবো। কিন্তু ইতালিয়ান ভাষা না জানার কারণে কিনতে পারছিলাম না। নিজ থেকে এগিয়ে এলো লিয়া। লিয়ার পুরো নাম নাতালিয়া বেনিদিয়াত্তো। লাল টকটকে চেহারা। একটা শর্টস পড়েছে। উরু থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত অনাবৃত। গায়ে একটা পাতলা টি-শার্ট। ভেতরের বক্ষবন্ধনী স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চুলগুলো হালকা রঙিন, এলোমেলো। দেখতে স্বর্গীয় উর্বসীর মতো।

 

আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। এত সুন্দরী একটা মেয়ে নিজ থেকে এগিয়ে এসে সহযোগীতার হাত বাড়াতে চাইছে। আমার কেন জানি বিশ্বাস হতে চাইছে না। যাই হোক একটু ধাতস্থ হয়ে কিছু খাবার কিনলাম লিয়ার সহযোগীতায়। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলায় আমি অবশ্য ততটা বাকপটু না। ছোটবেলা থেকেই একটু শরমিন্দা টাইপের। ফলে স্কুল-কলেজে মেয়ে বন্ধু ছিল না বললেই চলে।

 

এখন বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। ছোটবেলার শরমিন্দা কেটেছে বৈকি। তবু মেয়ে দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ার অভ্যাস আমার নেই। গায়ে পড়ে আড্ডা জমাতে পারি না। দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করি। তো লিয়াকে ছোট্ট করে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বেড়িয়ে এলাম গ্রোসারী শপ থেকে।

 

প্রচন্ড ক্ষুধা ছিল। বিকেল হয়ে আসছে প্রায়। গ্রোসারি শপের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারটা গলধকরণ করে ফেললাম এক নিমিষেই। একটা সিগারেট ধরিয়েছি। হালকা শীতল বাতাস। ইউরোপে সামার চলছে। মুগ্ধ করার মতো আবহাওয়া। দূরে নীল আকাশ। তাতে সাদা মেঘের ভেলা। সারি সারি বিল্ডিং। বেশিরভাগ বিল্ডিংয়েই হলদেটে রঙের প্রলেপ দেওয়া। আমার এক ঘণ্টা দশ মিনিটের ট্রেন ট্রানজিট। একটা ট্রেন থেকে নেমেছি। আরেকটায় উঠবো। হাতে এখনো ৪০ মিনিটের মতো সময় আছে।

 

:হেই, ইউ হেয়ার?

 

পাশ থেকে একটা পরিচিত নারী কণ্ঠের ডাকে চমকে তাকালাম। আনমনে নানাকিছু ভাবছিলাম। আর আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছিলাম গালভর্তি সিগারেটের ধোঁওয়া। ঢাকায় স্ত্রী-সন্তান। ফেলে আসা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন। গণমাধ্যমের সহকর্মী। চেনা মুখগুলোর অচেনা হয়ে যাওয়া। অনিশ্চিত ভবিষ্যত। ভারাক্রান্ত দেশ- ইত্যাদি নানারকম চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ফলে নারীকণ্ঠের ডাকে যেন সংবিৎ ফিরে পেলাম। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখি গালে টোল পড়া একটা হাসিমুখ। বাতাসে চুলগুলো মুখের ওপড় পড়ছে। সেগুলো সরানোতে ভ্রুক্ষেপ নেই। লাল টকটকে দুই ঠোট দিয়ে একটা সিগারেট চেপে ধরে আছে। হাতে গ্যাস লাইটার আছে, কিন্তু তা জ্বলছে না। ইশারায় আমার লাইটারটা চাচ্ছে। নাতালিয়া ভিনদিয়াত্তো। একটু আগেই যে আমাকে খাবার কিনতে সহায়তা করেছিল।

আমি হাই বলে লাইটার এগিয়ে দিলাম। আমিও আরেকটা সিগারেট ধরালাম।

 

: হোয়ার আর ইউ ফ্রম? জিজ্ঞাসা করলো নাতালিয়া।

: ঢাকা, বাংলাদেশ। ইউ?

: আই এম ইতালিয়ান। হোয়ার আর ইউ গোয়িং?

: মিলানো।

: ওহ হো.. আই অ্যাম অলসো গোয়িং মিলানো। মাই হোম টাউন।

 

একই ট্রেনের যাত্রী আমরা। সিটও একই কামরায়। অবশ্য পাশাপাশি না। এইবার যেন নাতালিয়া কথার ঝাঁপি খুলে বসলো। ততক্ষণে আমারও ছোটবেলার শরমিন্দা ভাবটা কেটে গেছে। আমার পরিচিতরা জানেন, আমি কথা কমও বলি আবার বেশিও বলি। অপরিচতদের সঙ্গে কথা কম বলি। কিন্তু পরিচিতরা জানেন আমি আড্ডাবাজ, ঘণ্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়া মানুষ। প্রচুর কথা বলি।

 

নাতালিয়ার সঙ্গে আড্ডাটা যেন জমে উঠলো। যেন বহু বছরের পরিচিত আমরা। আমার পেশা, পেশার অ্যাডভেঞ্চার শুনে এক্সাইটেড লিয়া। লিয়ার একসময় ইচ্ছে ছিল সাংবাদিক হওয়ার। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। হয়েছে সোশ্যাল ওয়ার্কার। সুইডেনে থাকে। সামারের ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিল মোনাকোতে। সেখান থেকেই যাচ্ছে বাড়িতে, মিলানো।

 

আড্ডাটা জমে উঠতে না উঠতেই ট্রেনের সময় হয়ে এলো। দুজনেই ছুটলাম স্টেশনে। একই কামরায় উঠলাম। কিন্তু লিয়ার সিট কামরার এক প্রান্তে, আমি অন্য প্রান্তে।

 

আমার মনটা কি একটু খারাপ হলো? আমি বুঝতে পারছি না। বয়স চল্লিশ পেরিয়ে গেলে এত আবেগ অবশ্য থাকে না। নানাবিধ বাস্তবতা আর কণ্টকময় যাপিত জীবনের কারণে ধুমধাম প্রেমে পড়ার ফুসরতও পাওয়া যায় না।

 

আমি সিটে বসে জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। ট্রেনে ছেড়ে দিয়েছে। বাইরে উঁচু উঁচু পাহাড়, আল্পস পর্বতমালার অংশ। পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে আছে হলদেটে বিল্ডিং। পরিচ্ছন্ন সড়ক। গাড়িগুল চলছে আপনমনে। কখনো কখনো সুড়ঙ্গ পথে ঢুকে যাচ্ছে ট্রেন। চারদিকে প্রায় অন্ধকার। একটু পরেই আলো। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর এসে পৌঁছাড়ালম স্যাভোনায়। ট্রেনের অনেক যাত্রী নেমে গেলেন। নতুন করে উঠলেনও কেউ কেউ।

 

স্যাভোনা থেকে ট্রেন ছেড়েছে মিলানোর উদ্দেশ্যে। আমি যথারীতি তাকিয়ে আছি জানালার বাইরে। সন্ধ্যা ছয়টা পেরিয়ে গেছে। কিন্তু অন্ধকার নামেনি। ইউরোপে সামারের সময় দিন বড়। সূর্য ডোবে প্রায় রাত সাড়ে নয়টার দিকে। বাইরের প্রাণ-প্রকৃতিতে ডুবে আছি। আমার এমনই অভ্যাস। দিনের ভ্রমণে আমি প্রকৃতি দেখি, বাড়ি-ঘর দেখি, আর দেখি মানুষ। ভাবি, এই যে যারা এখানে বাস করছে, তাদের থেকে কত দূরে থাকি আমি বা আমরা। কোনওদিন এই গ্রামে হয়তো আমার আসা হবে না। দেখা হবে না। ছোট্ট একটা জীবন, পৃথিবীর হাজার হাজার ভাগের এক ভাগও দেখে যেতে পারবো না। আহা..জীবন এত ছোট কেন? ইস, যদি তিন-চার শ’ বছর বাঁচতে পারতাম।

 

এলোমেলো এইসব ভাবতেই দেখি কে যে ল্যাবু… লেবু বলে ডাকছে। তাকিয়ে দেখি লিয়া। হাতের ইশারায় ডাকছে আমাকে। উঠে তার কাছে গেলাম। সে জানালো তার পাশের সিট খালি, আমি চাইলে সেখানে গিয়ে বসতে পারি। এত সুন্দরী একটা মেয়ে, বছর চারেক আগে গ্রাজুয়েশন করেছে, বয়স ২৭ এর মতো হবে, আমায় ডাকছে তার পাশে বসার জন্য। আমি না বলি কি করে? কলেজে যে পড়েছিলাম, সেই গল্প, দ্য লাঞ্চন। সেখানে একটা লাইন ছিল না- আই এম টু মাচ ইয়ং দ্যাট আই কান্ট সে নো টু উইমেন। সেইরকম আর কি। একান্ত অনুগত ছাত্রের মতো আমার ব্যাগ নিয়ে বসলাম লিয়ার পাশের আসনে।

 

গা ছুঁই ছঁই অবস্থা। একই হাতলে হাত রাখতে হয় দুজনের। গায়ে গা লেগে যাচ্ছে। লিয়ার শরীর থেকে সুন্দর একটা পারফিউমের ঘ্রাণ আসছে। আবারো আড্ডা জমে উঠছে। লিয়া কথা বলত বলতে কখনো কখনো যেন আমার গায়ের ওপর ঢলে পড়ছে। আমি কিঞ্চিৎ শরমিন্দা হচ্ছি। আমার ইংরেজিও অতটা ভালো না। একা একা কথা বলা যায়, কিন্তু আমাদের সামনের সিটে দুজন বয়স্ক নারী। তারা মাঝে-মধ্যে আড়চোখে তাকাচ্ছে আমাদের দিকে। আমি লিয়ার কথায় প্রাণান্তকরভাবে অংশ নিয়ে যাচ্ছি। ভেতরে ভেতরে নানারকম ভাবনা আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

 

রাত সাড়ে নয়টার দিকে আমরা মিলানো সেন্ট্রালে পৌঁছালাম। ট্রেন থেকে নামতেই আমার হাত ধরে টানতে লাগলো লিয়া। আমি তার শহরে নতুন। যেন মানুষের ভিড়ে হারিয়ে না যাই। তখনো মোবাইল নাম্বারও আদান-প্রদান হয়নি আমাদের। টানতে টানতে স্টেশনের বাইরে এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সিগারেট বের করলো একটা লিয়া। আমার মতোই চেইন স্মোকার। চিকন সিগারেট খায়। আমিও বের করলাম একটা। লিয়া তার সিগারেট ঢুকিয়ে রেখে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিল। আমার সিগারেট একটু টেস্ট করতে চায়।

 

ইউরোপে দেখেছি, মেয়েরা দেদারছে সিগারেট বা ইলেক্ট্রনিক সিগারেট খাচ্ছে। আমাদের দেশের মতো না, পুরুষ মানুষ খেলে সমস্যা নেই, নারী খেলেই জাত গেলো জাত গেলো বলে রব ওঠে। কিছুদিন আগেই তো লালমাটিয়ায় এক তরুণীর সিগারেট খাওয়া নিয়ে কি তুলকালাম কাণ্ডটাই না ঘটে গেল। আমি দেখেছি- অনেক শিক্ষিত কিংবা সেকুল্যার মানুষও ঢাকায় নারীদের সিগারেট খাওয়া সহ্য করতে পারে না। আড়ালে টিটকারি করে, ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। তাচ্ছিল্য করে। অথচ নিজে সিগারেট খায়।

 

লিয়া জানালো, সে যাবে কমো নামে একটি এলাকায়। সেখানেই তাদের বাড়ি। একটা লেকের পাশে। পর্যটন এলাকা। মিলানো থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে। আমার হোটেল জারা এলাকায়। সে ঠিকানা নিয়ে দেখে বললো, চলো তোমাকে হোটেলে উঠিয়ে দিয়ে আমি যাই। আমি বললাম, না না লাগবে না। আমি পারবো। একটা উবার ধরে চলে যাবো। সে জানালো নো নিড টু কল উবার। চলো মেট্রোতে যাই। আমি না করলেও আমার সঙ্গে যেতে চাওয়ায় আমি ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম। মনে মনে যে একটু আধটু এক্সেসিভ চিন্তা আসছিল না, তাও না। এরকম নাকি হয়। বন্ধুদের আড্ডায় শুনেছি, পড়েছি।

 

তিনটা স্টেশন পেরিয়েই জারায় আমার হোটেলে পৌঁছালাম। লিয়া একেবারে আমার রুম পর্যন্ত চলে আসলো। রুমটা ঠিকঠাক আছে কি না চেক করে দিল। বুঝিয়ে দিল কী কী করতে হবে। এক ফাঁকে ফ্রেশ হয়ে এলো। আদান-প্রদান হলো মোবাইল নাম্বার। জানতে চাইলো পরদিন আমার কী শিডিউল। আমি বললাম দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমি বিজি থাকবো। একজনের সঙ্গে সাক্ষাত হবে। দুপুর দুইটার পর আমি ফ্রি। বিকেল কমো লেকে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো লিয়া, তার বাড়িতে। রাতে থাকার নিমন্ত্রণ। বললো- বিকেল তিনটার দিকে বাসে করে চলে এসো। কোথা থেকে বাস নিতে হবে তাও বুঝিয়ে দিল। আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছি। জানি না আমার কী হয়েছিল তখন, আমার সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণ যেন লিয়ার হাতে। আমি যেন তার মুগ্ধ অনুসারী।

 

ঘড়ি দেখে দ্রুত বিদায় নিল লিয়া। যাবার আগে হাগ করে গেলো আমার সঙ্গে। অদ্ভুত এক শিহরণ খেলো আমার সারা শরীরে। চোখের পলকে বেড়িয়ে গেলো সে। আমি দরজাটা বন্ধ করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ভাবলাম কী হচ্ছে এসব? আমি কোথায় এসেছি। কে এই মেয়ে? কেন সে আমায় এত বন্ধু ভেবে বসে আছে?

 

ভ্রমণের কারণে শরীর ক্লান্ত হয়ে আছে। গরম পানির শাওয়ার নিলাম। উবার ইটস থেকে একটা ইতালিয়ান পিৎজা অর্ডার করলাম। খেয়ে একটু শুয়েছি। কিন্তু মন থেকে লিয়া যাচ্ছে না। যেন লিয়া আমার পাশেই শুয়ে আছে। আমার চুলে বিলি কাটছে লিয়ার কোমল আঙ্গুল। আর বকবক করে যাচ্ছে তার ছেলেবেলার সব দুষ্টুমির কথা।

 

ঢাকা থেকে আসা হোয়াটস অ‍্যাপ কলে যেন সংবিৎ ফিরে পেলাম। ঢাকায় ততক্ষণে মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলো হোটেলে পোঁছেছো? আমার হোটেলে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সে ঘুমায় না। টেনশন করে। তাকে আশ্বস্ত করে ঘুমাতে গেলাম। অপেক্ষা, কখন সকাল হবে, কখন কাজ শেষ হবে, কখন বিকেল হবে, কখন লিয়ার সঙ্গে দেখা হবে।

 

আমার টেনশন হচ্ছে, এসির ভেতরেও আমি ঘামছি, লিয়া কি তার বেডরুম শেয়ার করবে আমার সঙ্গে?