উঠানে মাদুর পেতে পড়ান নুরুল করিম, পৌঁছে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়

Share

একসময় শিক্ষকতা পেশায় আসার ইচ্ছাই ছিল না তাঁর। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই মানুষটিই হয়ে উঠেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের পথপ্রদর্শক। কোনো আর্থিক বিনিময় ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করেছেন। কখনো কলেজের শ্রেণিকক্ষে, কখনো শিক্ষার্থীদের বাড়ির উঠানে বসেছে তাঁর পাঠদানের আসর। তাঁর হাত ধরে প্রত্যন্ত নীলফামারী থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগের নাম ‘উঠান পাঠশালা’। এর নেপথ্যের মানুষ শিক্ষক নুরুল করিম।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে নীলফামারী সরকারি কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন নুরুল করিম। তবে শুরুতে শিক্ষকতা তাঁর পছন্দের পেশা ছিল না। ক্যাডার পরিবর্তনের আশায় আবারও বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দিতে শুরু করেন। সেই প্রচেষ্টাই একসময় অসংখ্য শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির নির্ভরযোগ্য অবলম্বন হয়ে ওঠে।

শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই অনুপ্রেরণা

নুরুল করিমের জন্ম বরিশালের হিজলা উপজেলার পূর্ব কৃষ্ণপুর গ্রামে। নদীবেষ্টিত প্রত্যন্ত ওই গ্রামের কৃষক পরিবারে তাঁর শৈশব কেটেছে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সকাল থেকে বিকেল, কখনো রাতেও শিক্ষকেরা তাঁকে পড়াতেন। জীবনের সেই সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া সহযোগিতাই পরবর্তী সময়ে অন্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

২০১২ সালে ফয়সাল মাহদী সবুজকে পড়ানোর মধ্য দিয়ে বিনা মূল্যে শিক্ষাদানের উদ্যোগ শুরু করেন নুরুল করিম। বর্তমানে সবুজ বাংলাদেশ পুলিশের একজন সার্জেন্ট। এরপর নিজের সরকারি বেতনে সংসারের খরচ চালিয়েও শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা কলেজের ক্লাস শেষে তাঁর বিভাগের কক্ষে এসে পড়াশোনা করত। প্রচলিত কোচিং সেন্টারের মতো নির্দিষ্ট ফি নিয়ে পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

করোনাকালে উঠানেই গড়ে ওঠে পাঠশালা

করোনাভাইরাস মহামারির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প উপায়ে পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেন নুরুল করিম। শিক্ষার্থীদের বাড়ির উঠানে মাদুর বিছিয়ে শুরু হয় পড়াশোনা। কখনো বাড়ির ছাদে, কখনো খোলা মাঠেও চলত পাঠদান। এভাবেই তাঁর উদ্যোগ পরিচিতি পায় ‘উঠান পাঠশালা’ নামে।

তাঁর পরিচালিত কোচিংয়ের নাম ছিল ‘ড্রিম টু ডিইউ’। মূলত নীলফামারী সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই সেখানে পড়াশোনা করত।

নুরুল করিমের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেত। কোনো কোনো বছর এই সংখ্যা ৬০ ছাড়িয়ে যেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পেয়েছে বলে জানান তিনি। ২০১৭ সালের একটি ব্যাচ থেকে প্রায় ১৬ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের ব্যাচে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী। তবে এসব সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান তাঁর কাছে সংরক্ষিত নেই।

ভর্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য

নুরুল করিমের কাছে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মো. ফরিদুলের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯৪ দশমিক ২০ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন ফরিদুল। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় তাঁর অবস্থান ছিল ১০৬তম। এসব ফলাফলের স্ক্রিনশট নুরুল করিমের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

শুধু প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়েই তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁদের পুনরায় চেষ্টা করার জন্য উৎসাহিত করতেন তিনি। কোনো শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরও শ্রেণিকক্ষে দেখা হলে দ্বিতীয়বার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এভাবে উৎসাহ পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।

শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতেও ভূমিকা রেখেছেন নুরুল করিম। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার খরচ বহন করতে না পেরে যেসব শিক্ষার্থী পড়ালেখা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবত, তাঁদের সহযোগিতার চেষ্টা করতেন তিনি। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ এবং পরিচিতজনদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করেছেন। এমনকি একজন মেয়ের জন্য দেড় লাখ টাকা সহায়তা সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তবে এসব আর্থিক সহায়তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব তাঁর কাছে নেই। কারণ, সহায়তাকারীরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের হাতে অর্থ তুলে দিতেন। ফলে কতজন শিক্ষার্থী কী পরিমাণ অর্থ পেয়েছে, তার সামগ্রিক পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

বিনা মূল্যে পড়ানো নিয়ে আপত্তির মুখে

শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পড়ানোর উদ্যোগ সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। এ কারণে সহকর্মীদের আপত্তির মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে। নুরুল করিমের অভিযোগ, একপর্যায়ে কলেজের তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপাল তাঁকে বাসায় ডেকে নিয়ে বিনা মূল্যে পড়ানো বন্ধ করতে বলেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর সুনাম বাড়ছে—এমন কারণ দেখিয়ে তাঁকে বদলির হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে এ ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতে আগ্রহী নন নুরুল করিম।

অন্যদিকে, এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তৎকালীন ভাইস প্রিন্সিপালের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীরাই হয়েছেন অন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষক

নুরুল করিমের উদ্যোগের প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর কাছে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে অন্যদের শিক্ষাদানে যুক্ত হয়েছেন। আবির, রাকিব, ইভান ও বাদশাহ ছুটিতে বাড়িতে এলে অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। তাঁদের মধ্যে প্রথম দুজন বর্তমানে চাকরি করছেন। এভাবে তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহযোগিতার দায়িত্ব নিয়েছেন।

তবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে পদায়নের পর প্রায় এক বছর ধরে নিজের এই শিক্ষামূলক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন নুরুল করিম।

স্বীকৃতির চেয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য

এত শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণে ভূমিকা রাখলেও নিজের উদ্যোগের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাননি নুরুল করিম। ভবিষ্যতে স্থায়ী কোনো শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও তাঁর নেই। বরং যত দিন ভালো লাগবে, তত দিন এ ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চান তিনি।

নুরুল করিমের পর্যবেক্ষণে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার পথে অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা হলো উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার অভাব। অনেক শিক্ষার্থীর সামর্থ্য ও সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক দিকনির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণার অভাবে তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।

নীলফামারীতে তাঁর কাছে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং কর্মজীবনে প্রবেশের গল্পগুলোই ‘উঠান পাঠশালা’র সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জন। কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা স্থায়ী অবকাঠামো ছাড়াই একজন শিক্ষকের আন্তরিক প্রচেষ্টা যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখাতে এবং সেই স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিতে পারে, নুরুল করিমের উদ্যোগ তারই একটি উদাহরণ।